বিনিয়োগ হ্রাস ও কর্মী ছাঁটাই করছে জ্বালানি তেল জায়ান্টগুলো

বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় বড় জ্বালানি তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো বড় পরিসরে খরচ কমানোর পথে হাঁটছে।

বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় বড় জ্বালানি তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো বড় পরিসরে খরচ কমানোর পথে হাঁটছে। এশিয়া থেকে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে মধ্যপ্রাচ্য—সবখানেই কর্মী ছাঁটাই, বিনিয়োগ হ্রাস বা স্থগিত, এমনকি প্রকল্প বিক্রিও করছে তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কভিড-১৯ মহামারীর পর জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে এভাবে ব্যয় হ্রাসের পথে হঁাটতে দেখেননি তারা। খবর এফটি।

শেভরন, বিপি ও কনোকোফিলিপসের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। কনোকোফিলিপস টেক্সাসের পারমিয়ান বেসিনে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কর্মী ছাঁটাই করবে বলে জানিয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে আট হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে শেভরন। জানুয়ারিতে ৪ হাজার ৭০০ জনকে চাকরিচ্যুত করেছে বিপি। বড় অধিগ্রহণের পর এসব কোম্পানি এখন পুনর্গঠনে ব্যস্ত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের শেল শিল্প সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। ডালাস ফেডারেল রিজার্ভের তথ্য অনুযায়ী, পাথরের খাঁজে জমে থাকা এ জ্বালানি তেল উত্তোলনকারীদের ব্যারেলপ্রতি অন্তত ৬৫ ডলার দাম নিশ্চিত করতে হবে। নইলে কোম্পানিগুলো মুনাফার মুখ দেখবে না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য বা অনেক সমুদ্রতীরবর্তী স্থানে খননে প্রাপ্ত জ্বালানি তেলে এর কম দামেও মুনাফা অর্জন করা যায়।

জ্বালানি খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালের শুরুর দিকেই ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারের নিচে নেমে যেতে পারে এবং কয়েক বছর এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে।

এ অবস্থায় ব্যয় সাশ্রয় ছাড়া বিকল্প নেই। ওয়াল স্ট্রিটের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমা জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলোর কারো পক্ষে বিনিয়োগ পরিকল্পনা, লভ্যাংশ ও শেয়ার পুনঃক্রয় একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এরই মধ্যে বিপি শেয়ার পুনঃক্রয় কমিয়েছে। মরগান স্ট্যানলিও সতর্ক করেছে যে অন্য কোম্পানিগুলোও একই পথে হাঁটবে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলোও চাপের মুখে পড়েছে। নগদ অর্থ পেতে সৌদি আরামকো ১ হাজার কোটি ডলারের পাইপলাইন শেয়ার বিক্রি করেছে। মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস পাঁচ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছে, জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ কমার প্রভাব হবে ব্যাপক। উড ম্যাকেঞ্জি বলছে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ও গ্যাস খাতে মূলধনী ব্যয় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমে দাঁড়াবে ৩৪ হাজার ১৯০ কোটি ডলারে, যা ২০২০ সালের পর প্রথম পতন। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য মতে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ২০২১ সালের পর প্রথমবার জ্বালানি তেলের উত্তোলন হ্রাস পেতে পারে।

টেক্সাসে বড় জ্বালানি তেল কোম্পানির অনেক কর্মী চাকরির ঝুঁকিতে রয়েছে। কনোকোফিলিপস জানিয়েছে, বড়দিনের আগেই প্রায় এক-চতুর্থাংশ কর্মী চাকরি হারাতে পারেন। বাড়তি খরচ ও শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় উৎপাদনও চাপে আছে। মারাউডার ক্যাপিটালের রো প্যাটারসন বলেন, ‘দাম কমায় নতুন খনন ও বিনিয়োগ থেমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে উৎপাদন ঘাটতি তৈরি করতে পারে।’

তবে সব কোম্পানির চাপ সমান নয়। এক্সনমবিল তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় রয়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) তাদের নগদ প্রবাহ ছিল ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার এবং ঋণও ছিল কম। তাই প্রতিদ্বন্দ্বীরা যেখানে সংকটে, এক্সন সেখানে কিছুটা স্বস্তিতে।

চাকরি ও বিনিয়োগ কমানোর পাশাপাশি বড় জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলো আউটসোর্সিং ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। হিসাবরক্ষণ থেকে প্রকৌশলসহ অনেক কাজ স্থানান্তর হচ্ছে ভারতসহ অন্যান্য দেশে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। এনার্জি ডেটা কোম্পানি এনভারাসের অ্যান্ড্রু গিলিক বলেন, ‘এআই জটিল বাজারে নতুনভাবে দক্ষতা এনে দিচ্ছে। সামনে এর ব্যবহার আরো বাড়বে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওপেক প্লাস জ্বালানি তেলের উত্তোলন বাড়িয়ে বাজার দখলের কৌশল নিয়েছে। এতে দামের ওপর চাপ থাকবে এবং ব্যয়বহুল শেল উত্তোলকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বড় কোম্পানিগুলো তাই টিকে থাকতে ছাঁটাই ও খরচ কমানোর পথেই হাঁটছে।

আরও